Thursday, December 31, 2015

ইসলামী পুনর্জাগরণের পদধ্বনি শুনছে বিশ্ব


সৈয়দ ইবনে রহমত :: মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ডোনাল্ড জন ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ‘মুসলমানরা হচ্ছে সন্ত্রাসী এবং তাদেরকে আমেরিকায় ঢুকতে দেয়া উচিত নয়; প্রয়োজনে সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে।’ তার এ বক্তব্যে আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে যে, রিপাবলিকানদের মাঝে এই চরম সাম্প্রদায়িক ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আর স্বাভাবিকভাবেই তার সমর্থকদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষও বাড়ছে। যা অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকার বিভিন্ন মসজিদে হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন অভিনেতা স্যামুয়েল এল জ্যাকসন বলেছেন, ‘আমেরিকার মুসলমানরা হালের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। অতীতে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হতো মুসলমানরা এখন সেই একই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।’
উল্লেখ্য, ফ্রান্সের প্যারিস এবং আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার অজুহাতে আমেরিকা, ফ্রান্স এবং ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বসূরি বুশ নাইন-ইলেভেনের ঘটনার অজুহাতে মুসলমানদের টার্গেট করেছিলেন। নতুন ক্রুসেডের ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিলেন আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে এক নিষ্ঠুরতম অন্যায় যুদ্ধ। বুশের ক্রোধ আর হিংসার অনল মুসলিম দেশ আফগানিস্তান হয়ে ইরাক, লিবিয়াকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে এখন ধ্বংস করছে সিরিয়াকে। ফলে জ্বলসে গেছে এসব দেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমান নর-নারী-শিশুর জীবন ও স্বপ্ন। আহত হয়ে আর্তচিৎকারে পৃথিবীর বাতাসকে ভারী করে তুলছেন তারও কয়েকগুণ বেশি মানুষ। যারা সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে জীবনটাকে আক্রে ধরে পালাতে পারছেন, তারা হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সর্বস্ব ফেলে ছুটছেন যে যেদিকে পারছেন। কেউবা পাহাড়-পর্বত ডিঙ্গাচ্ছেন, কেউবা ঝাঁপ দিচ্ছেন অথৈ সাগরে। সহায়-সম্বলহীন মানুষদের নিদারুণ জীবনের প্রতীক হয়ে আইলান কুর্দির ছোট্ট নিথর দেহটি বিশ্ববাসীর চোখে ভেসে ওঠার পূর্বপর্যন্ত যার ভয়াবহতা ছিল একেবারেই উপলব্ধির বাইরের বিষয়। অগণিত এসব ছুটন্ত মানুষজন বিশ্ব মোড়লদের ক্রীড়নক জাতিসংঘের হিসাবের খাতায় উদ্বাস্তুর সংখ্যাকে এক কোটির বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে অল্প সময়ের ব্যবধানেই। যদিও তাদের এই হিসাব প্রকৃত সংখ্যার এক নগণ্য অংশ মাত্র। খাতার হিসাবেরও এক ক্ষুদ্র অংশকে নিজেদের দেশে ঢুকতে দিয়ে আপন মহিমায় বিভোর ইউরোপ। বাকিরা পথে কিংবা জঙ্গলে খোলা আকাশের নিচে খেয়ে না-খেয়ে কাৎরাচ্ছেন। অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের চোখ থেকে অবিরাম নামছে অশ্রুধারা। তরুণ-তরুণীদের চোখ স্বপ্ন হারিয়ে, লক্ষ্য হারিয়ে দিশেহারা। এক মুঠো আহার আর মাথাগোঁজার ঠাঁই পাওয়ার মিনতি ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই কারো মুখে।

এসব দেখে এই মজলুমদের পাশে যাদের অভিভাবক হয়ে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেই বিশ্ব মুসলিম নেতারা নির্বিকার। তারা নির্যাতিত-নিপীড়িতদের যতটা না দেখছেন, তার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন ‘এরা শিয়া, সুন্নি নাকি অন্য কেউ’ সেই পরিচয়ের দিকে। অনেকে আবার নিজেদের আজন্ম তখ্ত হারানোর ভয়ে কম্পমান। কেউ কেউ মজলুমদের জন্য একদিকে চেক লিখে দিচ্ছেন, আবার অন্যদিকে জুলুমবাজদের ঘটিবাটিও টানছেন। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিন, আফগানিস্তানে ধ্বংসলীলা চালিয়ে হাত পাকানো শকুনেরা হামলে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের উপর। ফলে মুসলমানদের রক্তে ভেসে যাচ্ছে মরুভূমি, মুছে যাচ্ছে অসংখ্য নবী-রাসুল তথা ইসলামের নানা স্মৃতিচিহ্ন। ইউরোপ-আমেরিকায় মুসলিম বিদ্বেষ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় বহমান তাদের রক্তের স্রোত; উপমহাদেশের কাশ্মীর, আরাকান হয়ে প্রায় সর্বত্রই কোণঠাসা মুসলিম জাতি। পাশাপাশি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে মুসলিম জাতির কলঙ্ক তথাকথিত মুক্তমনা-যুক্তিবাদের মুখোশধারী সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টদের আস্ফালন দেখে মনে হচ্ছে, বুশের ঘোষিত নতুন ক্রুসেড সফল হতে যাচ্ছে। ফলে ধ্বংস হয়ে যাবে মুসলিম জাতি, মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যাবে ইসলামের। ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদের খেলাঘর; গত শতকের ’৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতন্ত্রীদের কোমর ভেঙ্গে যাওয়ার পর থেকে যা ছিল সাম্রাজ্যবাদ তথা পাশ্চাত্যের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া।

সম্ভবত পাশ্চাত্যের এই চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ হতে যাচ্ছে ভেবেই একটু ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও তাদের সাথে মুসলমানদের মাথায় বোমা ফেলার প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে রাশিয়া। লক্ষ্য হচ্ছে, মুসলমানদের রক্তে ভেজা মরুভূমিতে লুকিয়ে থাকা মনি-মানিক্যের ভাণ্ডারে ভাগ বসানো। বিভিন্ন দেশের মুসলিম শাসকদের মধ্যে বিরাজমান অনৈক্য-বিভেদ, দুর্বল সামরিক শক্তি, আরামপ্রিয় ও বিলাসী মানসিকতার কারণে সাম্রাজ্যবাদকে রুখে দেওয়ার সাহস এবং সামর্থ্য কোনোটাই আজ তাদের নেই বললেই চলে। তাছাড়া, আজকের বিশ্ব মুসলিম নেতাদের মধ্যে কোনো সালাউদ্দিনও দৃশ্যমান নেই; যিনি কিনা মহান আল্লাহর একত্ববাদের নিশান হাতে নিয়ে তাকবির ধ্বনিতে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পারেন জুলুমবাজদের অন্তরে। এইসব দেখে অনেকেরই হয়তো মনে হতাশা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নূরকে ফুৎকারে নিভিয়ে দেয়া যায় না। আর আল্লাহর মনোনীত দীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক শক্তি কিংবা সংখ্যাধিক্যের ঐক্যেরও প্রয়োজন পড়ে না। এটা উদ্ভাসিত হয় এর অন্তর্নিহিত শক্তি তথা স্বচ্ছতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব আর কল্যাণময় আদর্শের আলোয়। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী সভ্যতা দেখতে চকচকে হলেও, কাচের মতো ভঙ্গুর। আর সে কারণেই দেখা যায়, যখন যত বেশি ইসলাম তথা মুসলিম বিদ্বেষ-প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয় তখন তত বেশি ইসলামের প্রচার বাড়ে। ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে বেড়ে যায় কুরআনের অনুবাদ কপি বিক্রির হার। অমুসলিমদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের হারও বেড়ে যায় পাল্লা দিয়ে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় নাইন-ইলেভেনের পরের ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণে, রাসুল (সা.)কে নিয়ে শার্লি এবদোর ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের পরের ঘটনাগুলোতেও। কয়েক বছর আগে প্রকাশিত ফেইথ ম্যাটারস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ব্রিটেনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের হার দ্রুত বাড়ছে। এক দশকে দেশটিতে ধর্মান্তরিত মুসলিমের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর ব্রিটেনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নারী, ৭০ শতাংশের বেশি শ্বেতাঙ্গ এবং তাঁদের গড় বয়স ২৭ বছর। ফ্রান্স এবং জার্মানিতেও ইসলাম গ্রহণের হার প্রায় কাছাকাছি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্স সেন্টারের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। ২০৫০ সালের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীদের প্রায় সমান হবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা। আর তাদের ধারণা, ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ভারতেই বসবাস করবেন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলমান। ২০১০ সালে বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৬০ কোটি। পরের ৪০ বছরে তা বেড়ে দাঁড়াবে ২৭৬ কোটিতে। অনুমিত ৯০০ কোটি বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হবে মুসলমান। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। তবে মুসলমানদের মতো এতটা নয়। দিন দিন মুসলমানদের শুধু যে সংখ্যাগত বৃদ্ধিই ঘটছে, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় পিউ রিসার্স সেন্টারের অপর এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে। যেখানে প্রতিফলিত হয়েছে যে, বিভিন্ন মুসলিম দেশে ইসলামী চেতনা তথা শরিয়াভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা চালুর পক্ষে অধিকাংশ মুসলমানদেরই প্রত্যাশা রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে প্রকাশিত জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের ৯৯ শতাংশ মুসলমান শরিয়া আইনের পক্ষে; ইরাকের ৯১ শতাংশ, ফিলিস্তিনের ৮৯ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৮৬ শতাংশ, নাইজারের ৮৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ৮৪ শতাংশ, মরক্কোর ৮৩ শতাংশ এবং তালিকার সপ্তম স্থানে থাকা বাংলাদেশের ৮২ শতাংশ মুসলমান শরিয়া আইন চালুর পক্ষে।

শুধু যে মুসলমানদের সংখ্যা-চেতনা বাড়ছে তা-ও নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অমুসলিমদের মধ্যে বাড়ছে মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষের সংখ্যাও। যার প্রমাণ মিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের পর তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিশ্বজুড়ে তোলপাড় দেখে। তাই মুসলমানদের সামরিক শক্তিহীনতা কিংবা অনৈক্যের কারণে দৃশ্যমান বিপর্যস্থতাই একমাত্র বাস্তবতা নয়, বরং এর বিপরীতে অন্য একটি দিকও আছে। যে দিকে তাকালে দেখা যাবে, দ্রুতই বাড়ছে ইসলামের প্রচার-প্রসার। সত্য, ন্যায় এবং ভ্রাতৃত্বের আলোয় সৃষ্টি হচ্ছে নবজাগরণ, যার দৃপ্ত পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে গোটা বিশ্ব। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের মেকি সভ্যতার মুখোশধারীরা এটা উপলব্ধি করছে ভালোভাবেই। আর সে কারণেই তারা ইসলামের এই পুনর্জাগরণের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে অনেকটা দিশেহারা হয়েই সর্বশক্তি নিয়ে নেমে পড়েছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মুসলমানদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন মরুভূমিতে বহমান রক্তধারা থেকেই জন্ম নিবে নতুন শক্তির, নতুন নেতার। যাঁর হাত ধরে আবার উন্মুক্ত হাওয়ায় পতপত করে উড়বে ইসলামের বিজয় নিশান।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

No comments:

Post a Comment